ক্ষেত্রফল পরিমাপ

আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে—বাসার পড়ার টেবিল, খেলার মাঠ, কিংবা ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ড—সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট জায়গা বা পৃষ্ঠ আছে। এই পৃষ্ঠটি কতটা জায়গা জুড়ে আছে, তা নিখুঁতভাবে জানার নামই হলো ক্ষেত্রফল পরিমাপ। অষ্টম শ্রেণীর গণিত বিষয়ের ‘পরিমাপ’ অধ্যায়ের এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বাস্তব জীবনেও জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে ঘরের মেঝের টাইলস কেনা—সবখানেই আমাদের ক্ষেত্রফলের হিসাব করতে হয়।

চলুন, খুব সহজ ভাষায় এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলো এবং জটিল কিছু একক পরিবর্তনের নিয়ম আমরা সহজে বুঝে নিই।

ক্ষেত্রফল পরিমাপ

ক্ষেত্রফল পরিমাপ

ক্ষেত্রফল পরিমাপের মূল তিনটি সূত্র

যেকোনো ক্ষেত্রের আকৃতি অনুযায়ী ক্ষেত্রফল বের করার সূত্র বদলে যায়। প্রধান তিনটি আকৃতির সূত্র নিচে দেওয়া হলো:

  • আয়তাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল: কোনো জায়গার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যদি সমান না হয় (যেমন আমাদের বই বা মোবাইল স্ক্রিন), তবে তার ক্ষেত্রফল হবে: দৈর্ঘ্যের পরিমাপ (গুণ) প্রস্থের পরিমাপ

  • বর্গাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল: যে ক্ষেত্রের চারপাশের সবকটি বাহু সমান (যেমন লুডুর ছক্কা বা ক্যারম বোর্ড), তার ক্ষেত্রফল হবে: (বাহুর পরিমাপ) এর স্কয়ার অর্থাৎ বাহু (গুণ) বাহু।

  • ত্রিভুজাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল: তিন কোণ বিশিষ্ট কোনো জায়গার ক্ষেত্রফল বের করার নিয়ম হলো: ০.৫ (গুণ) ভূমির পরিমাপ (গুণ) উচ্চতার পরিমাপ

মনে রাখার বিষয়: ক্ষেত্রফল পরিমাপের আন্তর্জাতিক বা স্ট্যান্ডার্ড একক হলো বর্গমিটার। দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ গুণ হয়ে দুইবার ‘মিটার’ আসার কারণে এটি ‘বর্গমিটার’ হয়।

এককের গোলকধাঁধা: মেট্রিক, ব্রিটিশ ও দেশীয় পদ্ধতি

ক্ষেত্রফল মাপার জন্য পৃথিবীতে এবং আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় আলাদা আলাদা একক ব্যবহার করা হয়েছে। অংক করার সময় এই এককগুলোর সম্পর্ক মনে রাখা জরুরি।

মেট্রিক পদ্ধতি (যা আন্তর্জাতিক ও সহজ)

মেট্রিক পদ্ধতিতে প্রতি ১০০ গুণে একক পরিবর্তিত হয়:

  • ১০০ বর্গসেন্টিমিটারে হয় ১ বর্গডেসিমিটার।

  • ১০০ বর্গডেসিমিটারে তৈরি হয় ১ বর্গমিটার।

  • ১০০ বর্গমিটারকে বলা হয় ১ এয়র (বা ১ বর্গডেকামিটার)।

  • ১০০ এয়র মিলে তৈরি হয় ১ হেক্টর (বা ১ বর্গহেক্টোমিটার)।

  • ১০০ বর্গহেক্টোমিটারে হয় ১ বর্গকিলোমিটার।

ব্রিটিশ পদ্ধতি (ফুট-গজের হিসাব)

আমাদের দেশে এখনো ঘর-বাড়ির মাপজোখে এই পদ্ধতিটি বেশ প্রচলিত:

  • ১৪৪ বর্গইঞ্চিতে হয় ১ বর্গফুট।

  • ৯ বর্গফুটে হয় ১ বর্গগজ।

  • ৪৮৪০ বর্গগজে হয় ১ একর। আবার ১০০ শতক বা ডেসিমলো ১ একর হয়।

দেশীয় পদ্ধতি (জমি জমার হিসাব)

গ্রামাঞ্চলে বা জমির দলিলে আমরা এখনো এই এককগুলো প্রচুর শুনতে পাই:

  • ১ বর্গহাত সমান ১ গণ্ডা।

  • ২০ গণ্ডায় হয় ১ ছটাক।

  • ১৬ ছটাক মিলে তৈরি হয় ১ কাঠা।

  • ২০ কাঠায় হয় ১ বিঘা।

 

ক্ষেত্রফল পরিমাপ

 

বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে সম্পর্ক (কনভার্সন বা রূপান্তর)

পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভুল হয় এক পদ্ধতি থেকে অন্য পদ্ধতিতে যাওয়ার সময়। চলুন এই সম্পর্কগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক:

  • মেট্রিক ও ব্রিটিশ: ১ বর্গসেন্টিমিটার সমান প্রায় ০.১৬ বর্গইঞ্চি। ১ বর্গমিটার সমান প্রায় ১০.৭৬ বর্গফুট। আর ১ হেক্টর সমান প্রায় ২.৪৭ একর। উল্টোভাবে দেখলে, ১ বর্গইঞ্চি মানে ৬.৪৫ বর্গসেন্টিমিটার এবং ১ বর্গফুট মানে ৯২৯ বর্গসেন্টিমিটার।

  • দেশীয় ও অন্যান্য: ১ বর্গহাত মানে ৩২৪ বর্গইঞ্চি। ১ কাঠা বলতে বোঝায় ৭২০ বর্গফুট বা প্রায় ৬৬.৮৯ বর্গমিটার। ১ বিঘা মানে ১৬০০ বর্গগজ বা ১৩৩৭.৮ বর্গমিটার। আর ১ একর বলতে ৩ বিঘা ৮ ছটাক বা ৪০৪৬.৮৬ বর্গমিটার বোঝায়।

 

 

ক্ষেত্রফল পরিমাপ

 

 বাস্তব কিছু উদাহরণ ও সমাধান

চলুন বইয়ের কয়েকটি খটমটে উদাহরণকে সহজ ধাপে সমাধান করি, যা পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

উদাহরণ ১: একর থেকে বর্গমিটারে রূপান্তর

প্রশ্ন: যদি ১ ইঞ্চি = ২.৫৪ সেন্টিমিটার এবং ১ একর = ৪৮৪০ বর্গগজ হয়, তবে ১ একরে কত বর্গমিটার?

সহজ সমাধান:

আমরা জানি, ৩৬ ইঞ্চিতে ১ গজ হয়।

তাহলে, ১ গজ = ২.৫৪ (গুণ) ৩৬ সেন্টিমিটার = ৯১.৪৪ সেন্টিমিটার।

এটিকে মিটারে নিলে হয়: ৯১.৪৪ / ১০০ = ০.৯১৪৪ মিটার।

সুতরাং, ১ বর্গগজ = ০.৯১৪৪ (গুণ) ০.৯১৪৪ = ০.৮৩৬১২৭ বর্গমিটার (প্রায়)।

এখন আমাদের বের করতে হবে ৪৮৪০ বর্গগজের মান।

hisab অনুযায়ী, ৪৮৪০ বর্গগজ = ০.৮৩৬১২৭ (গুণ) ৪৮৪০ = ৪০৪৬.৮৬ বর্গমিটার (প্রায়)।

অর্থাৎ, ১ একর = ৪০৪৬.৮৬ বর্গমিটার

উদাহরণ ২: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জায়গা হেক্টরে প্রকাশ

প্রশ্ন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এলাকা ৭০০ একর। একে নিকটতম পূর্ণসংখ্যক হেক্টরে প্রকাশ করো।

সহজ সমাধান:

আমরা একটু আগেই জেনেছি, ২.৪৭ একর সমান ১ হেক্টর।

তাহলে, ১ একর = (১ / ২.৪৭) হেক্টর।

সুতরাং, ৭০০ একর = (১ (গুণ) ৭০০) / ২.৪৭ হেক্টর = ২৮৩.৪ হেক্টর।

যেহেতু প্রশ্নে ‘নিকটতম পূর্ণসংখ্যা’ চেয়েছে, তাই দশমিকের পরের অংশ বাদ দিলে উত্তর হবে ২৮৩ হেক্টর (প্রায়)

উদাহরণ ৩: আয়তাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয়

প্রশ্ন: একটি আয়তাকার ক্ষেত্রের দৈর্ঘ্য ৪০ মিটার এবং প্রস্থ ৩০ মিটার ৩০ সেন্টিমিটার। ক্ষেত্রটির ক্ষেত্রফল কত?

সহজ সমাধান:

এখানে দৈর্ঘ্য মিটারে আছে কিন্তু প্রস্থ মিটার ও সেন্টিমিটার মিলিয়ে আছে। অংক করার সুবিধার্থে আমরা সব কিছুকে সেন্টিমিটারে নিয়ে যাবো।

ক্ষেত্রটির দৈর্ঘ্য = ৪০ মিটার = ৪০ (গুণ) ১০০ = ৪০০০ সেন্টিমিটার।

ক্ষেত্রটির প্রস্থ = ৩০ মিটার ৩০ সেন্টিমিটার = (৩০ (গুণ) ১০০) + ৩০ = ৩০৩০ vanished সেন্টিমিটার।

আমরা জানি, আয়তাকার ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল = দৈর্ঘ্য (গুণ) প্রস্থ।

সুতরাং, ক্ষেত্রফল = ৪০০০ (গুণ) ৩০৩০ = ১২১২০০০০ বর্গসেন্টিমিটার।

এখন এই বিশাল সংখ্যাটিকে বর্গমিটারে নিতে হলে (১০০ (গুণ) ১০০) বা ১০,০০০ দিয়ে ভাগ করতে হবে।

১২১২০০০০ / ১০০০০ = ১২১২ বর্গমিটার।

আমরা জানি, ১০০ বর্গমিটারে ১ এয়র হয়। তাহলে ১২১২ বর্গমিটারকে লেখা যায় ১২ এয়র ১২ বর্গমিটার

ক্ষেত্রফল পরিমাপ

ক্ষেত্রফল পরিমাপের অংকগুলো দেখতে অনেক বড় বা জটিল মনে হলেও আসল ট্রিকটা লুকিয়ে আছে একক পরিবর্তনের মধ্যে। দৈর্ঘ্য আর প্রস্থকে সবসময় একই এককে (যেমন দুটোই মিটারে বা দুটোই সেন্টিমিটারে) এনে গুণ করলেই অংক পানির মতো সহজ হয়ে যায়!

মন্তব্য করুন